15/07/2026
ঢাকার এয়ারপোর্টে কার্গো গেট—যে গেট দিয়ে মালামাল নামানো হয়।
গত বছর এই গেট দিয়ে দেশে এসেছে চার হাজার আটশো তেরোটি কফিন। হিসাব করলে প্রতিদিন গড়ে তেরোটি। প্রতিদিন—ছুটির দিনেও।
কফিনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর জন্য সেখানে বসার কোনো জায়গা নেই। টয়লেট নেই। তারা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। তারপর কফিন খুলে শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটির মুখ দেখে।
গত ত্রিশ বছরে এই গেট দিয়ে দেশে ফিরেছে সাতান্ন হাজারের বেশি প্রবাসীর মরদেহ। সংখ্যাটি কল্পনা করা কঠিন। সহজ করে ভাবতে পারেন—একটি পুরো উপজেলা শহরের সব মানুষ কফিনে শুয়ে আছে।
হাবিব খালাসির কফিনটিও নেমেছিল এই গেট দিয়ে।
ফরিদপুরের ভাঙ্গার মানুষ হাবিব। বয়স তেত্রিশ। এক সন্তানের বাবা।
২০১৯ সালে ভাগ্য বদলানোর আশায় সৌদি আরব গিয়েছিলেন। রিয়াদের বাইরে মরুভূমিতে একটি পুরোনো উটের ছাউনি ভাঙার কাজ করছিলেন। কাজের সময় মাথায় লোহার টুকরা পড়ে তার মৃত্যু হয়।
তার ছোট ভাই সাংবাদিককে ফোনে বলেছিলেন, ভাই যখন টাকা পাঠানো শুরু করল, তখন মনে হয়েছিল আমাদের কষ্টের দিন শেষ হয়ে আসছে।
কিন্তু সেই কষ্টের দিন শেষ হওয়ার হিসাবটা একটু খুলে বলা দরকার।
বিদেশে যেতে একজন বাংলাদেশিকে গড়ে প্রায় পৌনে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করতে হয়। সেখানে গিয়ে তিনি মাসে গড়ে আয় করেন প্রায় বিয়াল্লিশ হাজার টাকা।
অর্থাৎ একজন সৌদিগামী শ্রমিকের শুধু বিদেশ যাওয়ার খরচ তুলতেই প্রায় দুই বছর লেগে যায়।
প্রথম দুই বছর মানুষটি নিজের জন্য কাজ করেন না। পরিবারের জন্যও না। তিনি কাজ করেন দালালের ঋণ শোধ করার জন্য।
আয়ের তুলনায় বিদেশ যেতে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয় বাংলাদেশের শ্রমিকদের।
হাবিব খালাসিদের মৃত্যুর পর কী হয়?
যে দেশে মৃত্যু হয়, সেই দেশ একটি সার্টিফিকেট দেয়। মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা থাকে—স্ট্রোক অথবা হার্ট অ্যাটাক।
বাংলাদেশ সেই কাগজ মেনে নেয়। যাচাই করে না। প্রশ্নও করে না।
অথচ বিদেশে যাওয়ার আগে বাধ্যতামূলক মেডিকেল পরীক্ষায় এই মানুষগুলোকে “সম্পূর্ণ সুস্থ” ঘোষণা করা হয়েছিল।
সুস্থ শরীরে বিদেশ গেলেন। তিরিশ কিংবা চল্লিশ বছর বয়সে “হার্ট অ্যাটাকে” মারা গিয়ে দেশে ফিরলেন।
তিরিশ বছরে এমন ঘটনা ঘটেছে সাতান্ন হাজারের বেশি। কিন্তু কোনো জাতীয় তদন্ত হয়নি।
কুমিল্লার প্রবাসী শ্রমিক কাজী সালাউদ্দিনের স্ত্রী ইয়াসমিন বেগম এখনো একটি ব্যাখ্যার অপেক্ষায় আছেন। তিনি জানেন, তার স্বামীর হৃদ্রোগ ছিল না। কিন্তু মৃত্যুসনদে লেখা হয়েছে—হার্ট অ্যাটাক।
এর ব্যাখ্যা তিনি আজও পাননি।
এবার যারা এখনো জীবিত আছেন, তাদের হিসাব করা যাক।
শফিকুল ইসলামের গল্পটি চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশ করেছে ব্লুমবার্গ।
তিনি মাঠে কাজ করা একজন সাধারণ মানুষ। ধারদেনা করে সাড়ে চার হাজার ডলার জোগাড় করেছিলেন। প্রতিশ্রুতি ছিল, মালয়েশিয়ায় গিয়ে নির্মাণশ্রমিকের চাকরি পাবেন।
কুয়ালালামপুরের বাইরে একটি জরাজীর্ণ ভবনের তৃতীয় তলায় তাকে রাখা হলো। সেখানে ছিল স্তূপ করে রাখা পুরোনো ম্যাট্রেস, মেঝেতে গর্ত করা দুটি টয়লেট এবং গোসলের জন্য একটি পানির হোস।
তাকে বলা হলো, অপেক্ষা করতে।
তিনি অপেক্ষা করলেন।
একশো সাতচল্লিশ দিন।
কিন্তু তার চাকরি কোনো দিন আসেনি। নিয়োগকর্তা ফোন ধরা বন্ধ করে দিলেন। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেল। আর দেশে প্রতিদিন তার ঋণের সুদ বাড়তে থাকল।
শফিকুল ইসলাম একা নন।
২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় গেছেন।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলেছেন, তাদের একটি বড় অংশ প্রতারণার শিকার হয়েছে। ভুয়া নিয়োগকর্তা, অস্তিত্বহীন চাকরি এবং ঋণের দাসত্বে আটকা পড়েছেন তারা।
অন্য একটি হিসাবে দেখা গেছে, দেড় থেকে দুই লাখ বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় গিয়ে সম্পূর্ণ বেকার অবস্থায় ছিলেন।
তারা ধার করে বিমানের টিকিট কিনেছেন। বিদেশে গেছেন। তারপর মাসের পর মাস কোনো কাজ পাননি।
এত বড় প্রতারণা সম্ভব হয়েছিল, কারণ মালয়েশিয়া যাওয়ার পুরো পথটি একটি চক্রের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেই চক্রের বাইরে দিয়ে যাওয়ার কার্যত কোনো সুযোগ ছিল না।
সরকার নির্ধারিত খরচ ছিল ঊনআশি হাজার টাকা। কিন্তু বাস্তবে একজন শ্রমিককে দিতে হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা।
প্রায় সাত গুণ বেশি।
দেড় হাজার এজেন্সির মধ্যে মাত্র একশোটিকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। পুরো ব্যবস্থা পরিচালিত হতো একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে। সিন্ডিকেটকে ফি না দিলে সেই সফটওয়্যারে কোনো অর্ডার আসত না।
জনপ্রতি দেড় লাখ টাকা দিতে হতো নগদে। টাকা না দিলে পাসপোর্ট আটকে রাখা হতো।
ব্লুমবার্গের অনুসন্ধান অনুযায়ী, গত দশ বছরে শুধু এই সিন্ডিকেট ফি হিসেবে দেশ থেকে একশো কোটি ডলারের বেশি অর্থ বেরিয়ে গেছে।
এই চক্রের শীর্ষে ছিলেন খোদ প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী—যে মন্ত্রণালয়ের নামের মধ্যেই “কল্যাণ” শব্দটি রয়েছে।
চব্বিশ হাজার কোটি টাকার মানবপাচার মামলায় তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছেন। তদন্তে সাবেক অর্থমন্ত্রী এবং সাবেক পুলিশপ্রধানের নামও এসেছে।
যে দপ্তরের কাজ ছিল শ্রমিকদের দালালের হাত থেকে রক্ষা করা, সেই দপ্তরের মন্ত্রীই ছিলেন সবচেয়ে বড় দালাল।
তবে গল্পটির সবচেয়ে অপমানজনক অংশ এটিও নয়।
এরপর মালয়েশিয়া বাংলাদেশকে একটি চিঠি পাঠিয়েছে।
সেই চিঠিতে ক্ষমা চাওয়া হয়নি। ক্ষতিপূরণের কথাও বলা হয়নি।
বরং বলা হয়েছে, তদন্তগুলো বন্ধ করতে হবে। কারণ এসব অভিযোগ নাকি “মালয়েশিয়ার সুনাম নষ্ট করছে।”
আমাদের শ্রমিক প্রতারিত হলো। আমাদের মন্ত্রী টাকা নিলেন। অথচ সুনাম নিয়ে উদ্বেগ তাদের।
বৈধ পথে যাদের এই অবস্থা, তারা তখন কী করে?
তারা সাগরে নামে।
গত বছর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানো মানুষের জাতীয়তার তালিকায় প্রথমে ছিল না সিরিয়া, সুদান কিংবা আফগানিস্তান।
প্রথমে ছিল বাংলাদেশ।
বিশ হাজারের বেশি বাংলাদেশি এই পথে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। মোট আগমনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
তালিকার অন্য দেশগুলোর অধিকাংশে যুদ্ধ চলছে। বাংলাদেশে যুদ্ধ নেই। তারপরও সাগর পাড়ি দেওয়া মানুষের তালিকায় বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে বেশি।
এই পথটিও মোটামুটি নির্ধারিত।
ঢাকা থেকে দুবাই অথবা মিশর হয়ে বিমানে লিবিয়া। এই পর্যন্ত সবকিছু বৈধ। টিকিট আসল, ভিসাও আসল।
লিবিয়ায় নামার পর “কাগজপত্র প্রক্রিয়াকরণের” কথা বলে পাসপোর্ট নিয়ে নেওয়া হয়।
এরপর বিনা বেতনে কাজ করানো হয়। একদিন মানুষটি জানতে পারেন, তাকে অন্য কোনো দালাল বা মালিকের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
“বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে”—এই কথাটি কোনো রূপক নয়।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনের ভাষায়, এই বাজারে অভিবাসী মানুষ হলো “লেনদেনযোগ্য সম্পদ”।
লিবিয়া-পথে যাওয়া তিরানব্বই শতাংশ মানুষ নির্যাতন, মুক্তিপণের জন্য আটক অথবা বন্দিত্বের শিকার হন।
সুনামগঞ্জের শাকিল এক বছরের বেশি সময় বেঁচে ছিলেন দিনে এক বেলা খাবার খেয়ে। খাবার বলতে শক্ত, বাসি রুটি এবং আধা লিটার পানি।
আরিফ নামে আরেক ব্যক্তির ঘটনাটি ২০২৪ সালের কোরবানির ঈদের রাতের।
ত্রিশজন ধারণক্ষমতার একটি নৌকায় পঞ্চাশজনকে তুলে দালালরা সাগরে ছেড়ে দেয়। নব্বই মিনিটের মধ্যে নৌকাটি উল্টে যায়।
আরিফ প্রথমে একটি তেলের ড্রাম ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন। পরে আরেক বাংলাদেশি তার হাতে বাতাস ভরা একটি বালিশ তুলে দেন।
সেই বালিশ ধরে তিনি সাত ঘণ্টা পানিতে ভেসেছিলেন।
শেষ পর্যন্ত সাঁতরে লিবিয়ার তীরে ফিরে আসেন।
বেঁচে ফেরার পুরস্কার হিসেবে তাকে যেতে হয় লিবিয়ার পুলিশের কারাগারে। দুই মাসের বন্দিত্ব এবং নিয়মিত নির্যাতন।
এই রুট এখন একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প।
বছরে অন্তত ষোলো থেকে উনিশ কোটি ডলারের ব্যবসা হয়। সামনের বছরগুলোতে তা পঁচিশ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানবপাচার ও মানব চোরাচালান বাজারগুলোর একটি।
আর গবেষণায় উঠে এসেছে আরও ভয়ংকর একটি তথ্য—বৈধ এবং অবৈধ পথে কাজ করা দালালদের নেটওয়ার্ক আসলে আলাদা নয়।
যে চক্র লাইসেন্স নিয়ে শ্রমিককে সৌদি আরব পাঠায়, সেই চক্রই আবার মানুষকে লিবিয়ার নৌকায় তুলে দেয়।
একই হাত। শুধু ব্যবসা দুটি।
যারা সাগর পার হয়ে ইতালিতে পৌঁছান, তাদের অবস্থাই বা কী?
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি নিজেই বলেছেন, তার দেশের কাজের ভিসা কেনাবেচা হচ্ছে। একটি ভিসার দাম উঠছে পনেরো হাজার ইউরো পর্যন্ত। আর এই তথ্য তাকে দিয়েছে বাংলাদেশেরই কর্তৃপক্ষ।
ইতালিতে পৌঁছানোর পর বহু বাংলাদেশির জায়গা হয় কৃষিজমির পাশের অস্থায়ী ঝুপড়ি-বস্তিতে।
ইতালির কৃষিখাতে প্রতি চারজন শ্রমিকের একজন গ্যাংমাস্টার চক্রের অধীনে কাজ করেন।
ইতালির তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী নিজেই এই ব্যবস্থাকে বলেছিলেন, “এটি একটি মাফিয়া।”
ঢাকার দালাল থেকে লিবিয়ার মিলিশিয়া, সেখান থেকে ইতালির মাফিয়া—পুরো শৃঙ্খলটি একবার খেয়াল করুন।
প্রতিবার হাতবদলের সঙ্গে মানুষটির দাম বাড়ে। আর তার মর্যাদা কমে।
এসব ঘটনার একটি সম্মিলিত ফল আছে।
সেই ফলটি লেখা আছে বাংলাদেশের পাসপোর্টে।
হেনলি পাসপোর্ট সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখন একশোতম।
গত বছরের প্রথম চার মাসেই সাড়ে তিন হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে বিদেশের বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যদিও তাদের হাতে বৈধ ভিসা ছিল।
গত আগস্টে এক দিনেই কুয়ালালামপুর বিমানবন্দর থেকে দুইশো চারজন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়।
আরব আমিরাত গত অক্টোবরে নয়টি দেশের নাগরিকদের ভিসা স্থগিত করেছে।
দেশগুলো হলো—সুদান, সোমালিয়া, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, লিবিয়া, লেবানন, ক্যামেরুন, উগান্ডা এবং বাংলাদেশ।
তালিকার প্রায় প্রতিটি দেশে যুদ্ধ চলছে অথবা রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
বাংলাদেশ সেই তালিকায় ঢুকেছে শান্তিতে থেকেও।
ওমান দরজা বন্ধ করেছে। মালদ্বীপ বন্ধ করেছে। মালয়েশিয়া বন্ধ করেছে। এমনকি জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়ও ভিসা না পাওয়ায় সিরিজে অংশ নিতে পারেননি।
একটি দেশের সাধারণ মানুষের কাগজপত্রকে পৃথিবী যখন আর বিশ্বাস করে না, তখন এর চেয়ে বড় জাতীয় অপমান খুব কমই হতে পারে।
কিন্তু এই অপমানের জন্য দায়ী কারা?
ভিসা জালিয়াতি করা শ্রমিক?
নাকি সেই চক্র, যারা জাল কাগজ তৈরি করেছে, ভুয়া চাকরি দেখিয়েছে এবং নির্ধারিত খরচের সাত গুণ টাকা নিয়ে মানুষগুলোকে বিদেশের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে দাঁড় করিয়েছে?
পৃথিবী শাস্তি দিচ্ছে যাত্রীকে।
কিন্তু অপরাধটি তার নয়।
এবার শেষ হিসাবটি করা যাক। রাষ্ট্রের হিসাব।
এই প্রবাসীরা গত অর্থবছরে দেশে পাঠিয়েছেন সাড়ে পঁয়ত্রিশ বিলিয়ন ডলার।
সংখ্যাটি বোঝার সহজ উপায় হলো—বাংলাদেশের পুরো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এর চেয়েও ছোট।
প্রবাসীরা এক বছরে দেশে যে পরিমাণ অর্থ পাঠান, রাষ্ট্রের সিন্দুকে মোট বৈদেশিক মুদ্রা থাকে তার চেয়েও কম।
রাষ্ট্র তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।
এতটাই কৃতজ্ঞ যে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ওপর আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দেয়। এ জন্য বছরে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার বাজেট রাখা হয়।
কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই প্রণোদনা মানুষটির জন্য নয়।
টাকাটির জন্য।
তাহলে মানুষটির জন্য রাষ্ট্রের বরাদ্দ কী?
মৃত্যু হলে তদন্ত?
হয় না।
বিদেশে দুর্ঘটনার জন্য বিমা?
আছে। তবে সেই বিমার প্রিমিয়ামও শ্রমিক নিজেই পরিশোধ করেন। দেশ ছাড়ার সময় বিভিন্ন ফির সঙ্গে তা কেটে রাখা হয়।
অর্থাৎ নিজের সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণের টাকাও শ্রমিক নিজেই জমা দিয়ে যান।
বিদেশি মালিক বা নিয়োগকর্তার ওপর কোনো দায় পড়ে না।
দূতাবাসের সহায়তা?
বৈরুতে যুদ্ধের মধ্যে আটকা পড়া রিপন বেপারীর ভাষায়, “রেমিট্যান্স কমলে সরকার আমাদের কথা বলে। তারপর আবার ভুলে যায়।”
আর মৃত্যু হলে?
কফিন দেশে আনার খরচ হিসেবে দেওয়া হয় পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা।
জীবিত অবস্থায় আড়াই শতাংশ।
মৃত অবস্থায় পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা।
এই হলো রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রবাসী শ্রমিকের চুক্তি।
একটি পুরোনো কলামে একজন সাংবাদিক তাদের নাম দিয়েছিলেন—“রেমিট্যান্স মেশিন।”
নামটি নিষ্ঠুর।
কিন্তু ভুল নয়।
এই মেশিনের কোনো শোরুম নেই। ওয়ারেন্টি নেই। সার্ভিস সেন্টার নেই।
এই মেশিন জমি বিক্রি করে। ভিটেমাটি বিক্রি করে। নিজের দাম নিজেই পরিশোধ করে। তারপর নিজেকেই বিদেশে রপ্তানি করে।
এরপর দালাল তার ভাগ নেয়।
মন্ত্রী ভাগ নেয়।
বিদেশি সিন্ডিকেট ভাগ নেয়।
লিবিয়ার মিলিশিয়া ভাগ নেয়।
ইতালির মাফিয়া ভাগ নেয়।
সবাই মানুষটির শরীর থেকে নিজের ভাগ নিয়ে যায়।
শুধু তার নিজের রাষ্ট্র শরীরটির দায় নেয় না।
রাষ্ট্র নেয় তার পাঠানো টাকা।
আর শরীরটি ফেরত আসে কার্গো গেটে।
মালামাল নামানোর গেটে।
কারণ রাষ্ট্রের খাতায় সে যেন চিরকালই একজন মানুষ নয়।
শুধু মালামাল।