18/09/2025
UK-তে ২ বছরের অভিজ্ঞতা। বিস্তারিত 🇬🇧
২ বছর | ২৪ মাস+
ইউকে আসার প্রায় দুই বছর পূর্ণ হতে চললো আমাদের। দেশে যে খুব খারাপ অবস্থায় ছিলাম এমন না। আমি একটি আমেরিকান ব্যাংকের ফাইন্যান্স ডিভিশনে কাজ করতাম প্রায় ৫ বছর যাবৎ। পাশাপাশি আইএলটিএস পরাতাম দেশের সবচেয়ে স্বনামধন্য আইএলটিএস প্রতিষ্ঠানে। আমার বউ ছিল ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ডাক্তার।
কাগজে কলমে যেটাকে বলে একদম সাজানো গুছানো সংসার। পরিবারের সবার সান্নিধ্যে থাকা, প্রতি ৩-৪ মাসে একটা করে ফরেন ট্রিপ, ঢাকার নতুন নতুন ক্যাফে রেস্টুরেন্টে খেয়ে বেরানো, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, নিজের ব্যান্ডের সাথে মিউজিক করা- জীবন বেশ যাচ্ছিলো। কিন্তু কোথায় যেন কী একটা খটকা লাগতো আমাদের দুজনরেই।
বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই খেয়াল করলাম ব্যাপারটা যে শুধু আমাদের তা নয়, আশেপাশে সবাই বিদেশ চলে গেসে, যাচ্ছে অথবা যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখানে বলে রাখা ভালো যে ২০১৯ সালের শেষ দিকে আমি এক্সপ্রেস এন্ট্রি ভিসায় কানাডা যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম, পয়েন্টও ছিলো (ড্র তে কাটওফ চলতেছিলো ৪৬৭, আমার ছিলো ৪৮১)। ইসিএ করতে দিলাম, যতদিনে ফাইল হাতে পাইলাম বিশ্বে কোভিড চলে আসছে, ড্র বন্ধ, বন্ধ আমার কানাডা যাওয়ার দরজা।
স্টুডেন্ট ভিসায় যেতে পারতাম কিন্তু খরচ, কোভিডের অনিশ্চয়তা এবং এটাকে একটা “সাইন ওফ ফেইট” মনে করে তখন আর যাইনাই। ২০১৯ সালের আগে আমার বাইরে যাওয়ার তেমন ইচ্ছাও ছিলোনা, বরং আমি ছিলাম দেশে থাকা সমর্থকদের দলে, ফাটায় অন্য মানুষদের ডিসকারেজ করতাম বাইরে যাইতে। তাই ২০১৯-এ অল্প ইচ্ছা জাগলেও, না হওয়াতে খুব একটা মন খারাপ হয়নাই।
আর এখন যখন ফিরে তাকাই, তখন চলে গেলে আমার বউয়ের সাথে কখনও হয়তো পরিচয়ই হইতো না, সো নো রিগ্রেটস! জিতসি!
তো ২০২৩ সালে সাজানো গুছানো জীবন ফেলে আমরা দুজন পাড়ি জমাই ইউকেতে। আমি জীবনেও কল্পনা করিনাই ইউকে কখনও থাকতে যাবো। আমেরিকা, কানাডা এমনকি অস্ট্রেলিয়াও ভাবসি জীবনের কোনো এক সময় কিন্তু নিয়তি বরই অদ্ভুত। ১ বছরের মাস্টারস (আমার পড়াশোনা পছন্দ না, ২ বছরের নর্থ আমেরিকান মাস্টারস আমাকে দিয়ে হবে না), নতুন ভাষা শেখার ঝামেলা না থাকা, ডাক্তারদের চাহিদা এবং একটা তুলনামুলক ক্লিয়ার পাথওয়ে, GRE/ GMAT না দেওয়া এবং ২০২২ সালে আমার এখানে প্রায় ১ মাস পর্যটক হিসেবে ঘুরে যাওয়া— এসবকিছু আমাদের ইনফ্লুয়েন্স করে ইউকে বেছে নিতে।
নিজেই আ্যপ্লাই করে ফেলি ইউনিভার্সিটি অফ ম্যানচেস্টার (Rank: 28), ইউনিভার্সিটি অফ গ্লাসগো (Rank : 67) এবং ইউনিভার্সিটি অফ সাউথহ্যাম্পটোনে (Rank: 87)। তিন জায়গা থেকেই অফার লেটার আসে। আমার বউয়ের PLAB পরীক্ষার কেন্দ্র, রাসেল গ্রুপ ইউনিভার্সিটি হওয়ার মর্যাদা— সব চিন্তা করে বেছে নেই ম্যানচেস্টার।
১ দিনেই দুজনের ভিসা হয়ে যায়। ২ বছরের ভিত্তিতে এখানকার ভালো/ খারাপ, প্রাপ্তি/অপ্রাপ্তি দিয়ে, যারা এখানে আসবেন, আসার কথা ভাবছেন তাদের হেল্প হবে।
📌
ভালো/ প্রাপ্তি
১. নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা এখানে দেশের চেয়ে অনেক বেশি
২. কেউ আপনার বেপারে নাক গলাতে আসবে না
৩. নো ট্রাফিক জ্যাম, অসাধারণ পাব্লিক ট্রান্সপোর্ট
৪. খাবারে ভেজাল নাই, শাক সবজি ফল একদম ফ্রেশ
৫. এখানে চাকরি করলে দেশে গেলে নিজেকে বড়লোক মনে হয়। (১ পাউন্ড= ১৬৫ টাকা). দেশে যখন ঘুরতে গেলাম সবকিছু পানির মত সস্তা লাগসে।দেশে যখন চাকরি করতাম উবারে চরতে গায়ে লাগতো, এবার যে মনে হইসে লালমাটিয়া থেকে উত্তরা মাত্র ৪ পাউন্ড?! এটা কিসু হইলো,লও উবার!
৬. বিদেশ ভ্রমণের সুবিধা। যারা আমাদের মত ঘুরতে পছন্দ করেন, এটা তাদের জন্য একটা আশীর্বাদ। সম্প্রতি Nadir On The Go - Bangla এর একটা ভিডিও দেখলাম আমাদের সবুজ পাসরোর্টের বিড়ম্বনা ও ভিসা রিজেকশন নিয়ে।
এখানে থাকার কারণে আমাদের টার্কিশ ভিসা হয় আবেদনের সাথে সাথে ৫ সেকেণ্ডে। আলবেনিয়া, মন্টেনেগরো, জিবরাল্টারে ভিসা ফ্রি। ইমিগ্রেশনে কেউ একটা প্রশ্ন করে না। আর এয়ারফেয়ার? ৪০০০-৫০০০ বাংলা টাকায় চলে যাওয়া যায় লন্ডন খেকে ইস্তানবুল। ঢাকা- কক্স ভাড়া এর চেয়ে বেশি।
৭. কাজ আদায়ের জন্য কোথাও ঘুষ/ স্পিড মানি দেওয়া লাগে না। আইনের শাসন তুলনামূলক ভালো
৮. বেতন নর্থ আমেরিকা/ দুবাই রেন্জ না তবে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি।
৯. ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স অসাধারণ। শুধু ইউরোপের কিছু দেশ আগায় থাকবে। বাংলাদেশের মত কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অফিসে বসে থাকে না। অলমোস্ট সব জায়গায় ওয়ার্ক ফ্রম হোম/ হাইব্রিড (আমি মাসের ৩০ দিনে মাত্র ৬-৭ দিন অফিস যাই) গড় বার্ষিক ছুটি ২৫-২৮ দিন+ সরকারি ছুটি মিলায় সবাই ৩৩-৩৬ দিন ছুটি পায়। সাথে দুই দিন করে উইকেন্ড।
১০. কোনো কাজ কেউ ছোট করে দেখে না।
১১. Life skills: এখানে এসে অনেক কিছু অটো শিখে যাবেন। আমার মত ভেদাইম্মা এখন excellent cook।
এবার আসি অপ্রিয় সত্যতে ❌
১. এখানে লিগ্যাল (NI job) চাকরি আগে যত সহজ ছিলো এখন তেমন সহজ নাই।
২. স্পন্সর জব পাওয়া লিগ্যালি খুব কঠিন হয়ে গেসে। অনেকে Illegally ক্যাশ জব করে, self -sponsorship করে বা স্পন্সর কিনে, সেটা আপনার ব্যাপার আপনি ওদিকে আগাবেন নাকি। ধরা খাইলে শেষ। আপনাদের জন্যই লিগ্যাল মানুষরা ঝামেলায় পরে।
৩. বেতন যেমন বেশি, খরচ ও তেমন বেশি। বাসা ভাড়া, কাউনসিল ট্যাক্স, ইনকাম ট্যাক্স, গ্যাস বিল, বিদ্যুৎ বিল, NI কস্ট, IHS ফি, ট্রান্সপোর্ট কস্ট, বাজারের খরচ— এসব শেষে যে ভালো জীবনের স্বপ্ন নিয়ে এখানে আসছেন, সে সেভিংস, ইনভেস্টমেন্ট ও বাসায় টাকা পাঠানো এসবের জন্য আপনি যদি স্পাউস সহ আসেন, দুজনকেই মাস্ট চাকরি করতে হবে।
৪. সেটেলমেন্ট রুলস কঠোর হচ্ছে। Phd, DBA, Work Visa, MReS ছাড়া স্পাউস ভিসা বন্ধ। মিনিমাম স্যালারি রিকয়ারমেন্ট বাড়তেসে শীঘ্রই।
৫. সম্প্রতি রাইট উইং মুভমেন্ট শুরু হইসে আমেরিকার মত। “Take Back Britain” এর জন্য বর্ণবাদিতা, ইসলামোফবিয়া বাড়তেসে। কিছু ছোট শহরগুলায় ভয়াবহ অবস্থা।
৬. এখানে শুধু স্কিলস ও যোগ্যতায় চাকরি হয়, একথা ডাহা মিথ্যা। নেটওয়ার্কিং, ভাগ্য, চেষ্টা চালায় যাওয়া অথবা রেফারেন্স খুব দরকার।আমি ৫০০+ আ্যপ্লাই এর পর প্রথম জব পাই ফুলটাইম।স্টুডেন্ট থাকা অবস্থায় আ্যপ্লাই শুরু করায় বেকার থাকতে হয়নাই। গ্র্যাড ভিসাও একদিনের মধ্যে আ্যপ্রুভ হয়ে যায়।
এরপর ২ মাসের মধ্যেই স্পন্সার জব পাই। আগের চাকরি ও প্রমোশন ও স্পন্সর অফার করে। ৩ মাস পর স্পন্সর নিয়ে ঢুকে যাই ইউকের সবচেয়ে বড় ব্যাংক গুলার একটায়। মোরাল অফ স্টোরি: প্রথম চাকরিটা পাওয়া কঠিন, এরপর বেপরটা একটু সহজ হয়।
৭. ডাক্তাররা আগে যত সহজে জব পাইতো, এখন NHS-এ হায়ারিং ফ্রিজ, সো ওটাও শেষ।
৮. এখানে জীবন অনেক রোবেটিক, একঘেয়ে ও বোরিং। সাথে চরম আনপ্রেডিক্টবল ওয়েদার আপনাকে ডিপ্রেশনে ফেলে দিতে পারে। পরিবার, বন্ধু, উৎসব ছাড়া আমেজবিহীন জীবন। ঈদ বলে কিছু নাই, ঈদে ছুটিও নাই।
৯. এখানকার খাবার জঘণ্য। বাংলাদশের খাবার ও ফুড সীন যে কত ভালো আর ভ্যালু ফর মানি এখানে আসলে বুঝা যায়। ইংলিশ ব্রেকফাস্টও বা্লাগেশী রেস্টুরেন্টগুলা ওদের চেয়ে ভালো বানায়। ইউকেতে লন্ডনের ফুড শুধু বেশ ভালো কিন্তু ভয়ানক এক্সপেনসিভ।
১০. এখানে আসলে অনেক হাটা লাগবে, নিজের সব কাজ নিজে করতে হবে। এ দায়িত্ববোধ ও মানসিকতা থাকতে হবে।
১১. বাসা ভাড়া পাওয়া, বাসা চেন্জ এখানে অনেক ঝামেলা। ২ বছরে ৪ বার পাল্টানো লাগসে আমার চাকরি বদলের জন্য। বিশ্বাস করেন, অনেক প্যারা।।
১২. দেশ প্রায় মিস করবেন। অনুশোচনা হবে, কেন আসলাম? আগেই ভালো ছিলাম। প্রথমদিকে যখন আসবেন ও সবকিছু টাকায় চিন্তা করবেন তখন অনেক কষ্ট হবে কিছু কিনতে গেলে।
আরও ভালো ও খারাপ দিক আসে। মনে পরলে বলবো। আমার বউ ইউকে জীবন নিয়ে একটা ভালো কথা বলসে, এটা নেটফ্লিক্সের স্কুইড গেম সিরিজের মত। সবাই হা-হুতাশ করবে কিন্তু কেউ গেম ছেড়ে দেশে ফিরবে না। মিলায় নিয়েন। সব শেষে বলবো আলহামদুলিল্লাহ ভালো আসি আমরা। ২ বছরে এটাই উপলব্ধি। ঢুকে পরসি গেমে, সব ঠিক থাকলে এখন ILR ও পরে সিটিজেনশিপের অপেক্ষায়। সবাই দোয়া করবেন আমাদের জন্য।
আপনাদের পরিচিত যারা এখানে আসতে চায় এটা তাদের সাথে শেয়ার করতে পারেন। আশা করি কাজে দিবে। উৎসাহ ও সাড়া পেলে, সামনে আরও কথা বলবো। আজ এ পর্যন্ত। ধন্যবাদ।
-Anwoy Mustafiz, Uk