02/10/2026
আরবের রৌদ্রদগ্ধ মরুপ্রান্তর। দুপুরের প্রখর রোদে চারপাশ যেন আগুনে পুড়ছে। আকাশে কোনো মেঘের অস্তিত্ব নেই, বাতাসে প্রবাহিত হচ্ছে আগুনের হলকা। যে মাটি মানুষের পায়ের ছোঁয়া পাওয়ার কথা, তা যেন লোহা গলানো উত্তপ্ত কড়াইয়ের রূপ ধারণ করেছে।
এমন এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে জনশূন্য তপ্ত বালুর ওপর শুইয়ে রাখা হয়েছে এক কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে। তাঁর পরনে কোনো পোশাক নেই, খালি শরীরটা পিষে যাচ্ছে ফুটন্ত বালুরাশিতে। অত্যাচার এখানেই শেষ নয়—পাষাণ মনিব আদেশের স্বরে ডেকে আনল বিশাল এক পাথরের খণ্ড। বেশ কয়েকজন লোক মিলে সেই প্রকাণ্ড, উত্তপ্ত পাথরটি চাপিয়ে দিল লোকটির বুকের ওপর।
নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তাঁর। বুকের হাড়গুলো যেন চুরমার হয়ে যেতে চাইছে। গলার রগগুলো ফুলে উঠে কালচে রূপ ধারণ করেছে। প্রতিটি মুহূর্ত তাঁর জন্য জীবনের শেষ মুহূর্ত বলে মনে হচ্ছিল। ওপর থেকে চাবুকের নির্মম আঘাত নেমে আসছে তাঁর চামড়াহীন রক্তাক্ত দেহে। আঘাতকারী যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, তখন চাবুক চলে যাচ্ছে আরেক জল্লাদের হাতে।
জালেম মনিব ওষ্ঠাগত আরক্ত চোখে গর্জে উঠে বলল—"এখনও সুযোগ আছে! তুই কি মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রবকে অস্বীকার করবি? তুই কি লাত আর উযযাকে ঈশ্বর বলে মেনে নিবি? তা না হলে আজ এই রোদে পুড়ে তোকে মরতে হবে!"
একটু নরম সুর, একটিবার মিথ্যা স্বীকারোক্তি—শুধুমাত্র এটুকুই পারত এই বিভীষিকাময় জাহান্নাম থেকে তাঁকে মুক্তি দিতে। মানুষটি চরম যন্ত্রণায় কাঁপছিলেন, ঠোঁট দুটি শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু চাবুকের প্রতিটি কষাঘাত আর পাথরের পিষ্টতার মুখে দাঁড়িয়েও সেই নিগৃহীত, অসহায় লোকটির জবান দিয়ে কোনো আহাজারি বা আকুতি বের হলো না।
সবাই ভাবল, তিনি হয়তো আর বেঁচে নেই। কিন্তু ফুটন্ত বালুতে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরটার নিচ থেকে অত্যন্ত ক্ষীণ, অথচ দৃঢ় এক প্রতিধ্বনি ভেসে এলো—
"আহাদ! আহাদ!" (আল্লাহ এক, আল্লাহ এক!)
জল্লাদ মনিব উমাইয়া ইবনে খালাফ ক্ষোভে উন্মত্ত হয়ে উঠল। চাবুকের আঘাত আরও দ্বিগুণ করে দিল। কিন্তু যতবারই শরীরের ওপর চাবুক আছড়ে পড়ছিল, ততবারই সেই নিস্তেজ দেহ থেকে একটি শব্দই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল—"আহাদ! আহাদ!"
তিনি কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না; আর এটি কোনো সাধারণ ক্রীতদাসের গল্পও নয়।
তিনি অন্য কেউ নন—তিনি আমাদের প্রাণের নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অত্যন্ত প্রিয় সাহাবী, জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত, ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হযরত বিলাল ইবনে রবাহ (রাযিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু)।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়াতের শুরুর দিকে যে কয়জন মহামানব সত্যের বাণী গ্রহণ করেছিলেন, বিলাল (রাঃ) ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তৎকালীন জাহেলিয়াতের যুগে একজন হাবশী দাসের কোনো মান-সম্মান বা সামাজিক অধিকার ছিল না। উমাইয়া ইবনে খালাফ যখন জানতে পারল বিলাল তার পূর্বপুরুষদের মূর্তি পূজা ছেড়ে এক আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছেন, তখন থেকেই শুরু হয় বিলালের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন।
মক্কার উমাইয়া ও তার দোসররা শুধু মরুভূমির উত্তপ্ত বালু ও বুকের ওপর পাথর চাপিয়েই ক্ষান্ত হয়নি; তারা বিলাল (রাঃ)-এর গলায় শক্ত দড়ি বেঁধে মক্কার দুষ্ট বালকদের হাতে তুলে দিত। বালকেরা তাঁকে মক্কার অলিগলিতে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে বেড়াত। পাথরের খাঁচে তাঁর শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে যেত, রক্তে রঞ্জিত হতো মক্কার পথ। তবুও বিলালের জবানকে স্তব্ধ করা যায়নি। তিনি ত্যাগের চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে উচ্চারণ করতেন আল্লাহর একত্ববাদের জিকির—"আহাদ! আহাদ!"
অবশেষে, একদিন এই নির্মম নির্যাতনের দৃশ্য দেখে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাযিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু)-এর হৃদয় কেঁদে ওঠে। তিনি উমাইয়া ইবনে খালাফকে বিশাল অর্থের বিনিময়ে (নিজের একজন অমুসলিম দাস দিয়ে) বিলালকে কিনে নেন এবং আল্লাহর ওয়াস্তে সম্পূর্ণ স্বাধীন করে দেন।
যে শরীরটা একদিন লাঞ্ছনা আর চাবুকের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল, সত্যের ওপর দৃঢ় থাকার কারণে সেই বিলালকে আল্লাহ তা'আলা এমন মর্যাদা দিলেন যে, পরবর্তীতে মক্কা বিজয়ের পর কাবাগৃহের ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে প্রথম আজান দেওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন এই হযরত বিলাল (রাঃ)!
~ আব্দুল্লাহ শাফি