23/09/2025
প্রতিভা রপ্তানি: এক আজব চুক্তি!
যখন মেধাবী মানুষ দেশ ছেড়ে যায়, তাকে বলে ব্রেইন ড্রেইন। আর যখন তারা দেশে থেকে যায়, তাকে বলে ব্রেইন গেইন। কিন্তু গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে এক সাংস্কৃতিক নিয়ম তৈরি হয়েছে, অভিভাবকদের স্বপ্ন এখন সন্তানদের বিদেশে পাঠানো, উচ্চশিক্ষার নামে স্থায়ীভাবে মাইগ্রেট করার প্ল্যান সহ। তরুণরাও এতটাই তাড়িত যে বিয়ের মতো ‘ছোটখাটো’ বিষয়ও পিছিয়ে দেয়, কারণ এতে নাকি কাঙ্ক্ষিত দেশের পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি (PR) পাওয়ার সুযোগ কমে যায়। প্রতিভা রপ্তানি মানে শুধু মেধার ক্ষতি নয়; এটা জাতির ভবিষ্যতের আশা-আকাঙ্ক্ষার ক্ষয়।
সস্তা শ্রমিকেরা দেশ ছাড়লে বেকারত্ব সাময়িক কমে বটে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তার খেসারত অনেক বেশি। আমি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, করপোরেট অফিস—সব জায়গার মানুষের সঙ্গে মিশি। দুঃখজনকভাবে, প্রায় সবাই স্বীকার করে যে তাদের সন্তানরা হয় বিদেশে পড়ছে, কাজ করছে, অথবা বিদেশে যাওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে আছে।
২০১৭ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী বাংলাদেশের ৮২% মানুষ দেশ ছাড়তে চায়। বিশ্বব্যাংকের তালিকায় ১৭৩ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ব্রেইন ড্রেইন-এ ৩১তম স্থানে!
বিদেশে পড়াশোনা ভীষণ ব্যয়বহুল। কিন্তু তাতে উৎসাহে ভাঁটা পড়ে না। যারা টাকার জোরে পারছে না, তারা দেশে থেকে যায় শুধু অভিজ্ঞতা জমিয়ে পরে বিদেশ পাড়ি দেবার আশায়। BUET, মেডিকেল কলেজ বা CMA-CA এর মতো পেশাগত প্রতিষ্ঠানের ডেটা নিলে দেখা যাবে, এক বিরাট অংশ ইতিমধ্যে পাড়ি দিয়েছে এবং প্রতিদিনই সে সংখ্যা বাড়ছে।
সামাজিক দিকটাও মজার। অনেক মেয়ে বিদেশে গিয়ে স্বাধীনভাবে থাকতে চায়, গৃহকর্মীর ওপর নির্ভরশীল জীবন বা শ্বশুরবাড়ির খুঁটিনাটি এড়াতে। আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি বেশ কয়েকজন মেধাবী নারী, যাদের ক্যারিয়ার ছিল উজ্জ্বল, কিন্তু স্বামীর কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। পারিবারিক ব্যবসার টিকে থাকার গবেষণায়ও একই প্রবণতা দেখেছি।
অভিজাত শ্রেণীর মেধাবীরা যখন দেশ ছাড়ে, তখন সেটা এক প্রকার অর্থনৈতিক বিপর্যয়। তারা শুধু প্রতিভা নয়, সাথে নিয়ে যায় বাপ-দাদার সম্পত্তির সম্পদও, মানি লন্ডারিং করে। তাদের অবদান পড়ে বিদেশের অর্থনীতিতে, বাংলাদেশের উন্নতিতে নয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মেধাবীরা অন্তত কিছু রেমিট্যান্স পাঠায়, যা তাদের বাবা-মায়ের খরচে কাজে লাগে। কিন্তু এই শূন্যতা পূরণ করতে বাংলাদেশকে প্রতিবেশী দেশ থেকে মাঝারি মানের প্রতিভা আমদানি করতে হয়, যার বার্ষিক খরচ ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি!
অন্যদিকে সস্তা শ্রমই আমাদের আসল গুপ্তধন। এরা প্রচুর রেমিট্যান্স পাঠায় আর শেষমেষ দেশে ফিরেও আসে। শুধু ২০২২ সালেই বৈদেশিক রেমিট্যান্স এসেছে ২১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
মেধা রপ্তানির আরেক বিপদ হলো নতুন উদ্ভাবনের ক্ষতি। সহজ উদাহরণ, ভারতের চন্দ্রযান-৩ চাঁদে পাঠাতে খরচ হয়েছে ৬১৫ কোটি রুপি। অথচ আমাদের উপগ্রহ মহাকাশে তুলতে লেগেছে ২৭৬৫ কোটি টাকা! পার্থক্যটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, মেধার ফাঁক পূরণ করতে কতোখানি অতিরিক্ত খরচ করতে হয়।
আসলে ব্রেইন ড্রেইন তখনই ঘটে, যখন কোনো দেশ নাগরিককে জীবনযাপনের মানসম্মত সুযোগ দিতে পারে না। সুশাসন, দুর্নীতি দমন, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, বিশ্বমানের শিক্ষা, এসব দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা ছাড়া মেধা ধরা যায় না। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ টানা, উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান বাড়ানো দরকার। অথচ আমাদের নীতিনির্ধারকেরা মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয়কে এখানে আসতে দেয় না; কিন্তু ছাত্রদের বিদেশে চলে যাওয়ায় কোনো মাথাব্যথা নেই।
অমর্ত্য সেন একবার বলেছিলেন, “যে দেশ নিজের সেরা মস্তিষ্কগুলো রাখতে পারে না, সে দেশ যেন গাছ, যে নিজের সেরা পাতাগুলো রাখতে পারে না।”
লেখক: মাহতাব আহমেদ