16/04/2017
পেশা জীবনে প্রবেশের পূর্বে যে ৫টি কর্মদক্ষতা সম্পর্কে জানা উচিৎ :
আপনি হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষ করেছেন, এমনকি প্রাসঙ্গিক নতুন কোন বিষয়ে ডিপ্লোমাও অর্জন করেছেন, কিন্তু পেশা জীবনে প্রবেশ করতে নামের পাশে এসব নতুন শব্দের সংযোজন আপনাকে কতটুকু প্রস্তুত করছে, ভেবেছেন কি কখনো?
কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আপনি হয়তো শিখে থাকবেন কিভাবে একাধিক প্রজেক্ট পরিচালনা করতে হয়, কিভাবে সময় ব্যবস্থাপনা করতে হয়, এবং একটি চমৎকার এক্সেল মডেল তৈরী থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্রের নিত্যপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সম্পর্কে। তবে, বাস্তব অবস্থাটা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং যা আপনি মুখোমুখি না হওয়া পর্যন্ত অনুধাবন করতে পারবেন না।
নিচে তেমন ৫টি দক্ষতার কথা বলা হয়েছে-
১. বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাথে কাজ করা:
আপনাকে নিশ্চয় অসংখ্য প্রকল্পে দলগত ভাবে কাজ করতে হবে এবং সামগ্রিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য বিভিন্ন ধরনের ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিত্বের মানুষের সাথে কাজ করতে হবে ।
সকালবেলা যে অভ্যর্থনাকর্মী ‘হ্যালো’ বলে আপনাকে স্বাগত জানায়, আপনার যে সহকর্মী কোন বিষয়ে অতিরিক্ত প্রশ্ন করাটা অপছন্দ করে, এবং যে ম্যানেজার প্রতি মূহুর্তে আপনার নতুন নতুন ধারনাকে ছুড়ে ফেলে দেয় তাদের সাথে এবং তাদের নিয়ে গড়ে উঠা অফিসের অতি সুক্ষ্ম সামাজিক রীতি নীতির প্রতি আপনি কিভাবে নিজেকে সম্পৃক্ত করবেন তা আপনাকে ঠিক করে নিতে হবে। একজন সহকর্মী হিসেবে শুধু কাজ করে যাওয়াই মূখ্য বিষয় নয়, অনুধাবন করতে হবে বিভিন্ন প্রজন্মের বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের মানুষ কিভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন, কিভাবে সামগ্রিক ভাবে প্রতিষ্ঠানকে নেতৃত্ব দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
এছাড়াও, ব্যাপারটা এমন নয় যে আপনি যে মানুষগুলোর সাথে দলগত হয়ে কাজ করছেন একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর তা ভেঙ্গে যাবে। দিনের পর দিন এবং বছরের পর বছরও একই ভাবে কাজ করতে হতে পারে। তাই আপনাকে আয়ত্ব করতে হবে একই দলে কি করে দীর্ঘ সময় ধরে নতুনত্ব যোগ করে কাজ করা যেতে পারে।
২. প্রতিযোগিতা:
আপনি যদি একজন খেলোয়াড় হয়ে থাকেন তবে আপনি তীব্র প্রতিযোগিতায় অভ্যস্থ হয়ে থাকবেন। আপনি কি মনে করেন, বাস্তবতার সংকীর্ণ কর্মজীবনে খেলার মাঠ থেকে নেয়ার কিছুই নেই? যদি তাই মনে করে থাকেন তবে আপনার ধারনা ভূল। অর্থ উপার্জন এবং কর্মজীবনের অগ্রগতি যদি একই সমান্তরালে চালিত হয় তখন সম্পূর্ণ নতুন উদ্দীপনা গ্রহন করা যেতেই পারে। তা হতে পারে আপনার গ্রাহকের জন্য, নিজের পদোন্নতির জন্য কিংবা বসের কাছে নিজের সক্রিয় পরিচয় তুলে ধরার জন্য। সুতরাং, কর্মজীবনে মানুষের প্রতিযোগিতা দেখার জন্য প্রস্তুত হোন যা আপনি আগে কখনো দেখেননি হয়তো। একই সাথে কিভাবে তাদেরকে পিছনে ফেলে নিজের মেধা, পরিশ্রম এবং অধ্যবসয় দিয়ে জয়ী হওয়া যায় তার জন্যও প্রস্তুত হতে হবে।
৩. দায়িত্বশীলতা:
পেশা জীবনে নিজের পছন্দমত মতো সময়সূচী মেনে চলার সুযোগ খুবই অল্প। অর্থাৎ, প্রতিদিন সঠিক সময়েই আপনাকে অফিসে পৌছোতে হবে। অতিরিক্ত ঘুমের কারণে ক্লাসে সঠিক সময়ে পৌছোতে না পারলে ক্লাস শিক্ষক যে নেতিবাচক চেহারায় আপনার দিকে তাকাতেন চাকরির ক্ষেত্রে এর প্রতিক্রিয়া আরও বেশি নেতিবাচক হওয়াটাই স্বাভাবিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনের সেইসব সকালের তুলনায় আপনার নতুন দায়িত্বসমূহ আরও বেশি প্রসারিত হবে সেটাই স্বাভাবিক। আপনাকে আপনার কাজ, প্রজেক্ট, মিটিং, এবং অনেক অনেক ই-মেইলের জন্য জবাবদিহিতা করতে হবে। যদি সঠিকভাবে সঠিক সময়ে আপনার কাজগুলো সম্পন্ন না করতে পারেন তবে তা আপনার প্রতি যে নেতিবাচক ধারনা তৈরী করবে, তা পরবর্তীতে অরিরিক্ত শ্রম দিয়েও পুন:স্থাপন করা সম্ভব নাও হতে পারে। একজনের দায়িত্বহীনতা আরও একজনকে প্রভাবিত করে এবং সামগ্রিকভাবে তা সম্পূর্ণ ব্যবসাকেই প্রভাবিত করে। তাই দায়িত্বশীল হতে হবে।
৪. উপস্থাপনা:
ক্লাস ভর্তি শিক্ষার্থীর সামনে প্রেজেন্টেশন দেয়ার মাধ্যমে পাবলিক স্পিকিং সম্পর্কে কিছুটা ব্যবহারিক জ্ঞানার্জন সম্ভব হতে পারে, কিন্তু বস কিংবা ক্লায়েন্টের সামনে কার্যকরভাবে কিছু উপস্থাপন করাটা অনেকটাই নতুন বিষয়। কোন বিষয়ে শুধু বর্ননা করে যাওয়া নয় ববং আপনাকে জানতে হবে কিভাবে একটি আইডিয়া বিক্রয় করা যায়। উপস্থাপনার বিভিন্ন পর্যায়ে আপনাকে নানাবিধ প্রশ্ন, হস্তক্ষেপ এবং মতপার্থক্যের সম্মুখীন হতে হবে। সম্পূর্ণ সময় খুব স্থির এবং মনোযোগি থাকতে হবে যাতে আলোচনার ক্ষুদ্র অংশও ছুটে না যায়। এছাড়াও অফিসের ভেতরে, সহকর্মীদের সামনে, বসের সামনে নিজের মতাতম উপস্থাপন করা থেকে নিজের ব্যক্তিত্ব উপস্তাপন করতে জানতে হবে যথাযথ ভাবে।
৫. মতামতের প্রতি শ্রদ্বাশীল হওয়া:
পরীক্ষায় কোন জটিল কোর্সে যদি ‘বি’ গ্রেড পেয়ে থাকেন তবে বেশ ভাল বোধ করতেই পারেন। আর যদি কোর্স টিচার গ্রেডিং এর ক্ষেত্রে খুব কড়া হয়ে থাকেন তবেতো কথাই নেই। কিন্তু ব্যবসায়িক দুনিয়ায় ‘বি’ মানে হলো আপনার ‘এ’ পাওয়া উচিত ছিল। এমনকি, এটা বলারও সুযোগ নেই যে আমিতো ‘বি’ পেয়েছি। আরও বেশি ভাল কিভাবে করা যায় বা যেত তার জন্য বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হবে। বোঝার চেষ্টা করুন কি বলতে চাচ্ছে এবং পরবর্তীতে ভাল করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
অপরদিকে, আপনি যখন অসাধারণ সাফল্যমন্ডিত কোন কাজ করেন তখন ‘এ’ এর উপর সন্তুষ্টিসূচক ‘+’ পাবেন না। এমনকি আপনি কিছুই নাও পেতে পারেন অথবা পদোন্নতির জন্য আপনাকে বছরের ভাল সময়টার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। প্রতিক্রিয়া অনুসারে কাজ করা এবং না করতে পারার মানে হচ্ছে - একটি নতুন মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হওয়া।
তাহলে, এই অপরিচিত জগতে প্রবেশ করতে আপনার কি ধরনের প্রস্তুতি গ্রহন করা উচিত? সে বিষয়ে অল্প হলেও কিছুটা ধারনা হয়তো পেয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করার পূর্বে সকল বিষয়ে জানা ও শেখা আপনার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু প্রথম চাকরি শুরু করার পূর্বে এসব দক্ষতা অর্জন ও অনুশীলন আপনার প্রস্তুতিতে ও দ্রুত নিজেকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।
স্নাতক শেষ করার পূর্বেই যত সম্ভব অফিসিয়াল কাজের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে চেষ্টা করুন। দেখা যাবে, সামান্য কাজের অভিজ্ঞতার ফলে খুব সহজেই আপনি একটি ফুল টাইম চাকরির ব্যবস্থা করতে পারবেন। এজন্য, ইন্টার্নশীপ, পার্ট টাইম, এমনকি ভলান্টিয়ার হিসেবেও কাজ করতে পারেন।
এছাড়াও ব্যবসায়িক বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষায়িত পাঠ নিতে পারেন। সত্যিকার অর্থে নিজেকে প্রস্তুত করতে চাইলে শুধু শিক্ষকের বক্তব্য শুনলেই হবেনা বরং প্রত্যেকটি আলোচনা ও কেস স্টাডি খুব যৌক্তিকভাবে পর্যালোচনা করতে হবে এবং নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, কিভাবে সেই বাস্তব অবস্থা মোকাবেলা করা যায়/ যেতে পারে।
সবশেষে, যত বেশি সম্ভব মানুষের সাথে কথা বলুন, একজন পেশাদার দিক নির্দেশনাকারী খুঁজে বের করুন যার বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে এবং আপনাকে নতুন পরিবেশ ও প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে ধারনা দিতে পারেন।
কিছু অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, এবং সঠিকভাবে চিন্তা করার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পেশাগত জীবনে চলার পথে যে নতুন নতুন পরিস্থিতির উদ্ভাবন হবে তা জয় করার যোগ্যতা এবং দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন।