13/05/2022
বাংলাদেশ *ব্যাংকের *সহকারী *পরিচালক *পদঃ কেন* এতো* জনপ্রিয়*?
ফেরদৌস কবির
জয়েন্ট ডিরেক্টর
বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক পদের চাকুরীটি নিঃসন্দেহে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয়তম চাকুরীগুলোর মধ্যে অন্যতম। রিসার্চ, পলিসিমেকিং ইত্যাদি বিষয়ে বরাবরই মেধাবীদের একটা আকর্ষণ কাজ করে, এজন্য সহকারী পরিচালকদের প্রায় প্রতিটি ব্যাচেই আইবিএ, বুয়েট এবং শীর্ষ ইউনিভার্সিটিগুলোর ইকোনমিক্স ডিপার্টমেন্টের গ্রাজুয়েটদের আধিক্য দেখা যায়। যারা রিসার্চ এবং পলিসিমেকিং রিলেটেড কাজের আকর্ষণে পড়াশোনা শেষের পরে দেশের বাইরে পাড়ি জমাতে চান তাদের মধ্যেও এই চাকুরীটির প্রতি একটা আকর্ষণ কাজ করে।
মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে আমি সেন্ট্রাল/কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ে সামান্য কিছু বলতে ইচ্ছুক, নাহলে অনেকের মধ্যে সেন্ট্রাল ব্যাংক বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্পর্কে একটা ভুল ধারণা থেকেই যাবে। অনেকেই মনে করেন সেন্ট্রাল ব্যাংক আর দশটা সাধারণ ব্যাংকের মতোই একটি ব্যাংক। ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। আমি সেন্ট্রাল ব্যাংকে জব করি শুনে অনেকেই জিজ্ঞেস করে...ভাই, আপনাদের ব্যাংকের এফডিআর এর রেইট কেমন, লোন ফ্যাসিলিটি কেমন ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি দুই-এক কথায় চেষ্টা করি তার ভুল ভেঙ্গে দিতে। সেন্ট্রাল ব্যাংক ব্যাংকিং সার্ভিস দেয় শুধুমাত্র দেশের সরকারকে এবং দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে (গুলিয়ে ফেলবেন না। ব্যাংকও একধরণের আর্থিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আমাদের দেশে NBFI গুলোর আইনী নাম হলো "আর্থিক প্রতিষ্ঠান")। এজন্য সেন্ট্রাল ব্যাংককে বলা হয় সরকারের ব্যাংক।
🟢বিখ্যাত আমেরিকান কলামিস্ট ও ব্যঙ্গ লেখক উইলিয়াম রজার্স একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, “সভ্যতার শুরু থেকে তিনটি দুর্দান্ত আবিষ্কার হলো: আগুন, চাকা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং”। এ উক্তি থেকে দেশের অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর গুরুত্ব কিছুটা হলেও উপলব্ধি করা যায়। উন্নতির সোপানে পৌঁছানোর জন্য রাষ্ট্র যে কয়টি সংস্থার উপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভর করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের অন্যতম। অর্থশাস্ত্রে ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ কে বলা হয় Lender of the Last Resort বা ‘শেষ অবলম্বনের ঋণদাতা’ অর্থাৎ দেশে অর্থ সংকট দেখা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকার বা বাণিজ্যিক ব্যাংক-কে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দিয়ে অর্থ প্রবাহে গতি সৃষ্টির মাধ্যমে আর্থিক খাতকে বাঁচিয়ে রাখে এবং আর্থিক খাতের উপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনে।
🟢‘প্রথম আলো’তে গত ১৯ এপ্রিল ২০২০ একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয় যার শিরোনাম ছিলো “সবাই তাকিয়ে আছি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিকে”। বৈশ্বিক মহামারী ‘করোনা’র ছোবল থেকে দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে বাংলাদেশের ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ অর্থাৎ ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’ কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করে আর তা কিভাবে বাস্তবায়ন করে তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন সরকারের নীতি-নির্ধারক, বেসরকারি নীতি-বিশ্লেষক ও বড় ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ।
🟢বিশ্বের বেশিরভাগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নামের মধ্যে ‘ব্যাংক’ শব্দটি থাকলেও পৃথিবীর কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকই প্রকৃতপক্ষে “ব্যাংক বা ব্যাংকিং ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নয়”; তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নামের শেষে “কর্পোরেশন, লিমিটেড বা লিঃ লেখা যায় না”। বাণিজ্যিক বা তফসিলি ব্যাংক এর উদ্দেশ্য জনগণকে ব্যাংকিং সেবা প্রদানের মধ্যমে মুনাফা অর্জন করা। পক্ষান্তরে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক জনগণের সাথে সরাসরি কোনো ব্যাংকিং করে না, বরং “সরকারের ব্যাংক” হিসেবে কাজ করে এবং আর্থিক বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দক্ষভাবে Monetary Instrument সমূহ পরিচালনার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা “জনকল্যাণে কাজ করে” (মুনাফা অর্জন উদ্দেশ্য নয়) এবং সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা করে।
🟢কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মৌলিক কাজগুলো হলো “মুদ্রানীতি পরিচালনা, কারেন্সি ইস্যু, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক খাতের ব্যবস্থাপনা” ইত্যাদি। অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক “মৌলিক কাজের” পাশাপাশি “আর্থিক প্রতিষ্ঠানের রেগুলেটরি ও সুপারভাইজরি অথরিটি” হিসেবে, দেশের পেমেন্ট সিস্টেমস ব্যবস্থাপক এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধেও কাজ করে। আবার বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের পক্ষে সঞ্চয়পত্র বিক্রি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত কাজও করে, যেটি মোটেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোন কাজের মধ্যেই পড়েনা।
(উপরের চারটি প্যারা আমার একজন ব্যাচমেইট কলিগের অনুমতিক্রমে তার পোস্ট থেকে কপি করা)
এবারে চলে আসি মূল আলোচনায়ঃ
✅সহকারী পরিচালক (জেনারেল) নিয়োগ পরীক্ষার পদ্ধতিঃ👇🏿👇🏿👇🏿👇🏿
🟢সহকারী পরিচালক নিয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রাইভেট ব্যাংকের মতো কোন শর্টলিস্টিং করা হয়না; আবেদনের ন্যুনতম যোগ্যতা থাকলেই আপনি খুব সহজে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এবং...এ যোগ্যতাও খুবই শিথিল। সরকার অনুমোদিত যেকোন ধরণের ইউনিভার্সিটি থেকে অনার্স (পাসকোর্স হলে তার সাথে মাস্টার্স থাকতে হবে) থাকলেই এনাফ। রেজাল্টের কিছু বাধ্যবাধকতা আছে অবশ্য। একটা সার্কুলার দেখে নিলেই ক্লিয়ার হয়ে যাবে সব। আবেদন করতে এক টাকাও লাগবেনা।
🟢পরীক্ষার পারফরম্যান্সটাই সবকিছু এখানে। আলাদা কোন স্কিলের টেস্ট নেওয়া হয়না এখানে। আপনি যদি নিয়োগ পরীক্ষায় ভালো করতে পারেন তাহলেই হবে, অতীত কোন ব্যর্থতার জন্য কোনধরণের বিরূপ প্রভাব পড়বেনা আপনার ফলাফলে। সিজিপিএ বেশী খারাপ হলে ভাইভা বোর্ডে বড়জোর জিজ্ঞেস করা হতে পারে কারণ। কোন ইউনিভার্সিটি থেকে পড়েছেন, মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন কি না…এসব কিছুই ম্যাটার করবেনা। তবে আইবিএ, বুয়েট বা টপ ইউনিভার্সিটির টপ সাবজেক্ট হলে ভাইভা বোর্ডে একটা পজিটিভ ইমপ্রেশন কাজ করবে।
🟢যারা ডাইভার্সিফায়েড কাজ খুব পছন্দ করেন তাদের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক খুব ভালো একটা অপশন হতে পারে। এটাকে "সেন্ট্রাল ব্যাংক" না বলে বরং "সেন্ট্রাল ব্যাংকিং সিস্টেম" বললেই ভালো হবে। অনেকগুলো অফিস এবং ডিপার্টমেন্টের সমন্বয়ে গঠিত এই সেন্ট্রাল ব্যাংকিং সিস্টেম। "পানি উন্নয়ন বোর্ড", " তুলা উন্নয়ন বোর্ড" টাইপের প্রায় ৪৫-৫০ টি ডিপার্টমেন্ট নিয়ে এই "সেন্ট্রাল ব্যাংকিং সিস্টেম"। বলা হয়ে থাকে একজন তুখোড় সেন্ট্রাল ব্যাংকার এক জীবনে বড়জোর ৬-৭ টা ডিপার্টমেন্টের কাজে এক্সপার্টাইজ অর্জন করতে পারে। এতোটাই বড় ব্যাপ্তি সেন্ট্রাল ব্যাংকের কাজের। সেন্ট্রাল ব্যাংকে আমার নিজের যোগদানের ৭ বছর পূর্ণ হয়ে গেলো। এর মধ্যে ছয় বছর আমি যেখানে কাজ করেছি সেটি পুরোদস্তুর একটি গোয়েন্দা সংস্থা (ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট)। আপনার প্রেষণে কাজ করার সুযোগ হতে পারে দুর্নীতি দমন কমিশন, বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট এবং এনবিআর এও। ভালো কর্মকর্তা হলে লিয়েনে কাজ করার সুযোগ আসতে পারে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা আইএমএফ এ। আবার সিনিয়র লেভেলে গেলে এমনও হতে পারে আপনাকে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে সমস্যায় আছে এরূপ কোন ব্যাংক বা এনবিএফআই এর শীর্ষপদে। এই লেভেলের ডাইভার্সিফায়েড কাজ করার সুযোগ আপনি দেশের আর কোন জবেই পাবেন না।
🟢রয়েছে বাইরের বিভিন্ন নামকরা ইউনিভার্সিটিতে স্কলারশিপের সুযোগ। AusAid, JDS, JISPA, ADB-JSP, DAAD, Endeavour Leadership Program, KOICA scholarship program, Chinese Govt Scholarship, USA Full Bright...কি নেই তালিকায়! সবগুলোতেই সেন্ট্রাল ব্যাংকারদের জন্য এক্সট্রা প্রিভিলেজ। আবার এমন অনেক স্কলারশিপ আছে যেখানে সেন্ট্রাল ব্যাংকার নাহলে আবেদনই করতে পারবেন না। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের Williams College এর Center for Development Economics। গত প্রায় ১৫ বছর ধরে উইলিয়ামস কলেজ ফোর্বস ম্যাগাজিনের র্যাংকিং অনুযায়ী ইউএসএ'র সেরা লিবারেল আর্টস কলেজগুলোর মধ্যে ১ নম্বরে অবস্থান করছে। অ্যাকসেপট্যান্স রেইট মাত্র ১৩%। ওখানের পলিসি ইকোনমিক্স এ এক বছরের মাস্টার্সের খরচ ৬৮ হাজার ডলার। ওরা এই কোর্সে জন্য প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে দুজন করে প্রফেশনালস কে সুযোগ দেয়। একজন সেন্ট্রাল ব্যাংক থেকে একজন সরকারের অর্থ বিভাগ থেকে। জিআরই তে ডিসেন্ট একটা স্কোর লাগে বিধায় প্রায় প্রতিবছরই এখানে শুধুমাত্র সেন্ট্রাল ব্যাংকের কর্মকর্তারাই যেতে পারেন। আবার ইউএসএর টপ ইউনিভার্সিটিগুলো (আইভি লিগসহ) যেখানে হয়তো ভর্তি হতে পারাটাই খুব ভাগ্যের ব্যাপার সেখানেও দেখা যায় সেন্ট্রাল ব্যাংকার পরিচয়ে আপনি প্রিভিলেজ পাচ্ছেন।
🟢সবচেয়ে বড় একটি সুবিধা হলো পোস্টিং হবে শহর এলাকায়। বিভাগীয় শহরগুলো ছাড়া কোথাও কোন কার্যালয় নেই (বগুড়া ব্যতিক্রম)। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল কাজগুলো সম্পাদিত হয় মূলত ঢাকার প্রধান কার্যালয় এবং মতিঝিল কার্যালয় থেকে। দুইটাই একই বাউউন্ডারির মধ্যে, মতিঝিলে। এখানেই কাজ করে প্রায় ৬০০০-৬৫০০ এমপ্লয়ি। বাকী কার্যালয়গুলোতে গড়ে ৩০০-৬০০ জন করে এমপ্লয়ি। শুধুমাত্র শহর এলাকায় পোস্টিং হওয়ার কারণে আপনার সন্তানকে ভালো স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করাতে পারবেন কিনা সে টাইপ দুশ্চিন্তা একটু কম থাকবে।
🟢প্রোমোশন পলিসি খুবই স্মুদ। আপনার পারফরম্যান্স যদি খুব বেশী খারাপ না হয়, অথবা সিনিয়র কারও সাথে সরাসরি বেয়াদবি না করেন তাহলে পিএমএস (এসিআর) খারাপ হবেনা। সিরিয়াল মেইনটেইন করা হয় অটোমেশনের মাধ্যমে। সিনিয়রিটি ব্রিচ করে কাউকে প্রমোশন দিয়ে দেওয়ার প্র্যাকটিস নেই মোটেই। সময় হলে অটোম্যাটিক্যালি দেখবেন আপনার প্রমোশন হয়ে গেছে। কাউকে ধরাধরি করার কোন দরকার নেই; সে প্র্যাকটিসও নেই এখানে।
🟢ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালান্সের বিষয়টি পুরোপুরি আপনার নিজের উপরে নির্ভর করবে। কাজের প্রেশার নির্ভর করবে আপনি কোন ডিপার্টমেন্টের কোন সেকশনে পোস্টেড তার উপরে। ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে আমার পোস্টিংয়ের প্রথম চার বছর আমাকে গড়ে রাত ৮ঃ৩০ টা পর্যন্ত অফিস করতে হয়েছে। এর মধ্যে টানা প্রায় দুই বছর শুক্র-শনিবার ছুটির দিনেও অফিস করতে হয়েছে। আবার আমার অফিসেই এমন সেকশন ছিলো যেখানে গৎবাঁধা ১০ টা-৬ টা অফিস; আবার অফিসে বেশীরভাগ সময়েই হাতে কাজ থাকেনা। যেখানে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বেশী সেখানে দেশের বাইরে ট্রেনিং প্রোগ্রাম, সেমিনার, কনফারেন্স এ অংশগ্রহণ করারও সুযোগ বেশী। পারফরম্যান্সের মাধ্যমে কিভাবে নিজের অবস্থান তৈরী করে নিতে হবে। আমার একজন এক্স সুপারভাইজর এ পর্যন্ত ৩৭ টি দেশে সরকারী কাজে ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে অনেক দেশে আবার একাধিকবার।
🟢নিজের কাজ নিজেকেই করতে হবে। ২০০২ সালের দিকে সম্ভবত যখন বাংলাদেশ প্রতিবছর দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হচ্ছিলো তখন দেশে দুর্নীতি কমানোর জন্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কিছু রিকমেন্ডেশনস ছিলো। এর মধ্যে অন্যতম ছিলো বড় বড় সরকারী অফিসগুলোতে ৩য়/৪র্থ শ্রেণীর নিয়োগগুলো বন্ধ করে দেওয়ার; কারণ তাদের অবজারভেশন ছিলো আমাদের দেশের দুর্নীতির বেশীরভাগই এদের মাধ্যমে হয়। তখন অন্য কোন প্রতিষ্ঠান তাদের রিকমেন্ডেশন অনুযায়ী না কাজ করলেও দেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক সেটি অ্যাডপ্ট করে। ফলাফল...আপনিই কর্মকর্তা, আপনিই পিয়ন। বিদেশী কালচারের মতো। অন্য সকল সরকারী প্রতিষ্ঠানে ৩য় শ্রেণীর কর্মচারীরা অফিস নোট রেডি করে দেয়, কর্মকর্তারা শুধু সাইন করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের এডি/ডিডি রা নিজেরাই নিজেদের অফিস নোট টাইপ করবে, নিজেরাই ফটোকপি করবে, স্ট্যাপলিং করবে, ফাইলিং করবে। এটার কারণে যদিও মাঝে মাঝে খুব বিরক্ত হই আমরা। প্রচুর প্রোডাক্টিভ সময় নষ্ট হয়।
🟢প্রচুর পাওয়ার...কিন্তু পাওয়ার এক্সারসাইজের সুযোগ নেই। অন্যান্য সরকারী অফিসের কর্মকর্তাদের মতো শো-অফের সুযোগ নেই। সুযোগ নেই বলা ভুল; আসলে সেই কালচারটা নেই এখানে। আমাদের এখানে যে সবাই ধোয়া তুলসী পাতা সেটা বলছিনা। অনেকেই সুযোগ পেলে দুই-চারটা কলা-মুলো নেন না সেরকম না। তবে তারা সংখ্যায় খুবই নগণ্য এবং তাদেরকে অফিসে খুবই বক্রচোখে দেখা হয়।
🟢বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে তুলনা করলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাজ মূলত ছিঁচকে চোর ধরা টাইপ। সেটা নিয়েই প্রত্র-পত্রিকায় তাদের হাজার অস্ফালন। এরকমও শোনা যায় যে অনেকেই জনপ্রিয়তা অর্জন করার জন্য নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে পত্রিকায় রিপোর্ট করান...হা হা হা। অন্যদিকে আমাদের এখানে কাজ করতে হয় রাঘব-বোয়াল ও না, তিমি মাছের এগেইন্সটে। দেশের সর্বোচ্চ প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে। অন্যরা যেখানে ৫-১০ লাখ টাকার দুর্নীতি/আত্মসাৎ ধরলে ফলাও করে নিউজপেপারে চলে আসে আমাদের এখানে এ সুযোগ নেই। কিন্তু আমাদের কেইসগুলো থাকে হাজার হাজার কোটি টাকার। খেলতে হয় Catch me if you can টাইপের অপরাধীদের বিরুদ্ধে। আমার পাশের ডেস্কের কলিগ কয়েকদিন আগেই একটা ব্যাংকের ৭৬ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি ধরে সেই ব্যাংককে সেটা সরকারী কোষাগারে জমা দিতে বাধ্য করেছেন। কি ইউনিক একটা বুদ্ধি করে যে তারা সেই ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে সেটা যদি জানতেন! রাঘববোয়ালদের সাথে বুদ্ধির খেলায় জিততে হবে আপনাকে। জিতে গেলেও কিন্তু মানুষকে সেটা জানাতেও পারবেন না। অথচ নিউজপেপারে অন্যান্য সরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সামান্য (৫-৭ লাখ) টাকার কেইস ক্র্যাকডাউনের পর নিউজপেপারে দেখবেন তাদের কি পরিমাণ বন্দনা হয়। এনিওয়ে...এ ধরণের বড় বড় কাজ করবেন দেশের জন্য, কিন্তু কাক-পক্ষীও জানতে পারবেনা আপনার কাজের কথা...এই কন্ডিশনে যদি রাজী থাকেন তাহলে আপনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও প্রভাবশালীদের দাপটে তেমন কিছুই করতে পারবেন না সেটা ধরে রাখবেন আগে থেকেই। কিন্তু যখনই একটু ফাঁকফোকর পাবেন ইচ্ছামতো আঁচড়ে দেওয়ার সুযোগ পাবেন। সেই আঁচড়ের মূল্যই দেখবেন ৩-৪ হাজার কোটি টাকা!
যাহোক, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি আসলে সবখানেই থাকে। আপনি যদি শো-অফ করতে চান, ফেসবুকে লক্ষ লক্ষ ফলোয়ার (তাদের বেশিরভাগই হয়তো উপরে উপরে আপনাকে প্রেইজ করলেও মনে মনে বাবা-মা তুলে গালি দেয়) পেতে চান...তাহলে আপনার জন্য অন্য পাবলিক সার্ভিস ভালো হবে। অবশ্য আমার পরিচিত অনেকেই আছে পাবলিক সার্ভিসে যারা সরাসরি জনগণকে সেবা করার লক্ষ্য নিয়েই গেছে সেখানে। শো-অফ, ফলোয়ার এসবের ধার ধারেন না তারা। সেন্ট্রাল ব্যাংকাররা আসলে পাবলিক থেকে দূরে। সাধারণ জনগণকে আসলে কোন সার্ভিসই দেওয়ার সুযোগ নেই তাদের। কপাল খারাপ হলে সঞ্চয়পত্র বিক্রি টাইপের জায়গায় যদি পোস্টিং পেয়ে যান তখন আবার সাধারণ জনগণকে সার্ভিস দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
শেষে একটা কথা বলতে চাই...কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়েও মাঝে মাঝে পিয়নের কাজ করার মতো মানসিকতা থাকলে আপনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক চমৎকার একটা ওয়ার্কপ্লেস হবে। ক্যারিয়ার নিয়ে আফসোসে ভুগবেন না কখনো। সবসময় শহর এলাকায় পোস্টেড থাকবেন এটাকেও অনেকে বেশ ভালো একটা সুযোগ মনে করেন।
এডি নিয়োগের জন্য অলরেডি নতুন সার্কুলার হয়ে গেছে। সঠিক উপায়ে প্রিপারেশন নিতে থাকেন। ইন শা আল্লাহ হয়ে যাবে। এবারে এডি নিয়োগের প্রস্তুতি নিয়ে বেশ কিছু পোস্ট দেওয়ার ইচ্ছা আছে। কানেক্টেড থাকবেন।
✍️✍️✍️✍️✍️
ফেরদৌস কবির
জয়েন্ট ডিরেক্টর
বাংলাদেশ ব্যাংক, চট্টগ্রাম।