19/04/2026
এমন শোকার্ত লেখা ...মন ভালো নেই।
গুরুই পারেন এভাবে শিষ্যকে তুলে ধরতে। এই কান্না আমাদেরও।
সম্রাট ঘটক
জন্ম – ১৫/১২/১৯৭৫
মৃত্যু - ১৯/০৪/২০২৬
আমার দীর্ঘদিনের থিয়েটার সঙ্গী সম্রাট ঘটক আজ প্রয়াত হয়েছে।
সম্রাট আর আমি একসঙ্গে বহুবার ব্রাত্যজনের মঞ্চে উঠেছি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। ২০০০ সালে,যখন ওর বয়স মাত্র ২৫,তখন আমার সঙ্গে থিয়েটারের পথ চলা শুরু ওর।
আমার থিয়েটার "শহর ইয়ার"( গিটার বাদক চরিত্রে), "হেমলাট, দ্য প্রিন্স অফ গরাণহাটা"(ঝন্টু চরিত্র), "কৃষ্ণগহ্বর" ( রঙ্গন চরিত্রে), "রুদ্ধসঙ্গীত" (হেমাঙ্গ বিশ্বাস চরিত্রে),"কে?’( মনোজ চরিত্রে) "বোমা" ( মতিলাল চরিত্রে), "মীরজাফর" ( রায়দুর্লভ চরিত্রে ) এবং ব্রাত্যজনের আরও বিভিন্ন থিয়েটারে আলো ও অন্ধকারের ভেতর দিয়ে নিঃশব্দে নিজের আত্মাকে উজাড় করে দিয়েছে সম্রাট। প্রতিটি চরিত্রে, প্রতিটি সংলাপে সম্রাট নিজের এক টুকরো জীবনবোধ রেখে গেছে। আমার পরিচালিত “তারা” ছবিতে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েও সেই এক চিরাচরিত অনন্য সম্রাট। মীরজাফরে রিহার্সালে সাব টাইটলিং করেছে, এমনকি আমার জোরাজুরিতে ব্রাত্যজনের নাট্যপত্রতে নাট্য সমালোচনা লিখেছে। লিখেছে ব্ল্যাক থিয়েটার নিয়ে প্রবন্ধ, "থিয়েটারের হাড়গোড়" গ্রন্থে নাট্যভাষা নিয়ে নিবন্ধ।
ব্রাত্যজনের দলের সঙ্গে অভিনয় করতে সম্রাট গেছে, যেমন দেউলটি থেকে দিল্লি, তেমনই লন্ডন থেকে মার্কিন যুক্তরাজ্য।
ব্যক্তিগত জীবনে সম্রাট ছিল মৃদুভাষী, নম্র, সজ্জন এবং একইসঙ্গে অনিয়ন্ত্রণযোগ্য, নাশকতাধর্মী এবং নৈরাজ্যপ্রবণ। মস্তিষ্কের মধ্যে অতিকায় আ্যলবেট্রস পক্ষীর সেই ডানা ঝাপটানোর উন্মাদ সময়গুলোতে ওকে সামলানো সত্যিই কঠিন ছিল।
কিন্তু চোখের সামনে তাও সামলানো যেতে পারে, কিন্তু আড়ালে?
কতদিন, কতক্ষণ, কত লহমা?
যখন স্নায়ুর সংবেদন আসলে তৈরি করে দেয় এক অনপনেয় বিচ্ছিন্নতা আর নি:সঙ্গতা। পৃথিবীকে হয়তো তখন লাগে অচেনা, ঝাপসা আর দূরবর্তী কোনও গ্রহ। স্থির প্রত্যয়ে কেউ হয়তো তখন উপনীত হয়, না:,ঢের হয়েছে। এই ধোঁয়া ধুলো নক্ষত্রভরা বিশাল আ্যটলাসের ভেতরে এবার সত্যিই দম আটকে আসছে।
সম্রাট ক্রমশ খইতে থাকা, সেই অলৌকিক সংবেদনের অধিকারী ছিল।
সঙ্গীত আর অভিনয়ের প্রতি ওর এক তীব্র প্যাশন থাকলেও, অবসাদ আর প্রেমহীনতার মোহেনজোদারো স্তুপ থেকে ও তাই কোনও দিন বেরোতে পারেনি।
এখনো মনে পড়ে, এক রাতে ওর কথায় ওর ফ্ল্যাটে নিমন্ত্রণে গেলে, থালায় ধোঁয়া ভর্তি ভাত, আর ওর নিজের হাতে রান্না করা খাবারের কথা, ওর সেই সহর্ষ, আন্তরিক, আনন্দিত দুটি উজ্জ্বল চোখের কথা। আর একরাশ স্বপ্ন আর নতুন উদ্দীপনার কথা। ওর কৌতুক বোধও প্রবল তীব্র আর অন্তর্ঘাতী ছিল।যদিও অসাড় হতে থাকা জীবনে সেসব কবে যেন প্রস্তরীভূত হয়ে গেল।
আমার পুরনো বহু সঙ্গীদের ভেতরে আমি নিশ্চিত ভাবেই বহুদিন হল মারা গিয়েছি। আমার ভেতরে তাদেরও অনেকে মারা গেছেন।
কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে দেখা না হলেও সম্রাট সচল আর তুঙ্গ জীবন্ত হয়ে আমার ভেতরে বেঁচে ছিল। ওর সব খবরই পেতাম। দেখা হয়তো হত না কিন্তু বেঁচে তো ছিল। গুরু শিষ্য সম্বাদ ব্যতিরেকে নিছকই এক অভাবনীয় মানুষ হয়ে।
আজীবন আমার ভেতরে ধকধক করে বেঁচেও থাকবে।
অবিকল সম্রাটের মতই।
বহু থিয়েটারে বহু অভিনয় সম্রাট করেছে। কিন্তু অনেক মানুষ বা দর্শক ওর করা "রুদ্ধ সঙ্গীত"-এ 'হেমাঙ্গ বিশ্বাস' চরিত্রের অভিনয় মনে রেখে দিয়েছেন।
নিচে ওই প্রযোজনার একটি স্থিরচিত্র দেওয়া রইলো।
যে সদাহাস্যময় মুখে অবশ্য এখন মৃত্যুর ঘোর লেগে আছে।