17/02/2026
বিষাদের সব ক্ষণ ভেঙে ঘরে এলো রমাদান। আকাশের বিস্তীর্ণ নীলিমা জুড়ে আমি এক অভাবনীয় সুখকর আমেজের ছোঁয়া পাচ্ছি। জানি, এই একবিংশ শতাব্দীর বুকে দাঁড়িয়ে রমাদানের সেই শুভ্রতা অনুভব করা কঠিন যা অনুভব করতেন আমাদের সালফে সালেহীন। যাদের তিলাওয়াত বিধৌত সকাল-সন্ধ্যা রমাদানের মাধুর্য আর গাম্ভীর্যকে ফুটিয়ে তুলতো নিপুণভাবে।
আজকের এই আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়ে রমাদানের আগমনে অনেকরকম আয়োজন দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এসবের কোনোটাতেই নেই শুভ্রতা বা পবিত্র নিখাদ ইবাদতের আবেশ। অধিকাংশই রমাদানকে ব্যবহার করছে নানারকম দুনিয়াবি স্বার্থ হাসিলের এক মহা সুযোগ হিসেবে। দীনী লেবাসে এমন অনেক কাজ হচ্ছে যেখানে ইবাদত, ইখলাস আর ইসলাহের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের তাগাদা বেশি। নানারকম সাজসজ্জা হচ্ছে, হরেকরকম খাবারের তালিকা হচ্ছে, শুধু তালিকা হচ্ছে না নিজেকে পরিশুদ্ধ করার। রুটিন হচ্ছে না একটু একটু করে নিজেকে সংশোধনের।
রমাদান বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে রাত চারটায় উঠে সাহরি খাওয়া তারপর ফজর নামাজ পড়ে ঘুমানো, ঘুম থেকে উঠে সারাদিন অলস সময় পার করা আর সন্ধ্যায় নানারকম বাহারি খাবার দিয়ে ইফতার করা। ইফতারের পর টুকটাক এখানে ওখানে মুখ দিয়ে তারাবীহ পর্যন্ত সময় নষ্ট করে তারাবীহ পড়া এবং তারাবীহর পর রিলস, টিকটক বা অযথা গল্পগুজব করে ঘুমিয়ে যাওয়া। আমাদের অধিকাংশের রমাদান এই ধরাবাঁধা চক্রেই আবর্তিত হয়। অধিকাংশেরই নেই কোনো রমাদানকেন্দ্রিক পরিকল্পনা।
অনেকে আবার শয়তানের মতো শুধু রমাদান মাসে গুনাহের কাজ পরহেজ করে চলে। কাউকে গুনাহ করতে দেখলে বলে, রমাদান মাস দেখে বিরত আছি। আবার কেউ মন্দ আচরণ করলে বলে, রমাদান মাস দেখে গালি দিলাম না। তাদের কাছে রমাদানে খারাপ বা গুনাহের কাজ হারাম, আর অন্যান্য মাসে আরাম। তেমনিভাবে অধিকাংশের ইবাদতও হয় রমাদানকেন্দ্রিক, যেন এই সময় ইবাদত করলে বাকি সারাবছর না করলেও চলে।
কেউ কেউ তো রোজা রেখে গুনাহের কাজ করে বলে, আলহামদুলিল্লাহ আমি একটা সিনেমার কাজ পেয়েছি, আল্লাহ চাহেতো রমাদানের বরকতে খুব ভালো করব, অথবা আলহামদুলিল্লাহ রোজা রেখে একটা মিউজিক বানিয়েছি, সবার কাছে দুআ চাই যেন এমন মিউজিক আরো উপহার দিতে পারি। অনেক অবৈধ সম্পর্কের কপোত-কপোতী আবার সাহরির সময় একে অপরকে জাগিয়ে দেয়, কেউ কেউ আবার কুরআন তিলাওয়াত করেও শোনায়। সবচেয়ে কমন যে গুনাহটা আমাদের দেশে হয়, সেটা হলো, দীনের ফরজ বিধান পর্দাকে তরক করে বহু পরিবার গাইরে মাহরামদের সঙ্গে নিয়ে একসাথে সাহরি-ইফতার করে। এগুলো সতর না ঢেকে মাথায় পাগড়ি বাধার মতো । এ ধরনের বিভিন্ন গুনাহ নিয়মিত করে তারা আবার রমাদানের বরকত কামনা করে!
এগুলো একটা মুসলিম সমাজ পচে যাওয়ার ফলাফল। আজকে ১৭-২-২০২৬ তারিখে আমরা দেখেছি কুরআন তিলাওয়াত করে কুফরি সংবিধানের ও শাসনতন্ত্রের পথে চলবার শপথ নেওয়া হচ্ছে —বিসমিল্লাহ বলে আমি আল্লাহর আইনের উপরে জনগণের অভিপ্রায়কে প্রাধান্য দেওয়ার ব্যাপারে শপথ করলাম! এগুলো একদিনের ফসল না। বছরের পর বছর ধরে আমাদের অনুসরণীয় পশ্চিমা শিক্ষা কারিকুলাম ও অপরদিকে আমাদের ধর্মীয় ঠিকাদারদের অবহেলা এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে। খোদ আলেমরা যখন এসব ফিতনায় সন্তুষ্টির সাথে জড়াচ্ছেন তখন সাধারণ মানুষের জড়ানোটা তো আশ্চর্যের কিছু না।
ফিতনা আর নষ্ট সমাজের ফিরিস্তি অনেক দীর্ঘ। এগুলো আমাদেরই জাতিগত অবহেলার ফলাফল। এই অশৃংখল সমাজের মধ্যেও সময় বয়ে চলে। এক রমাদান গিয়ে আরেক রমাদান আসে। আমাদেরকে সংশোধিত হওয়ার আহ্বান জানায়। কিন্তু নিতান্ত নগণ্য লোকই রমাদানের আহ্বানে সাড়া দিতে পারে। যারা চেষ্টা করে, তারাও অনেক অজ্ঞতা, জাহালাত এবং ফিতনার কারণে পরিপূর্ণ সফল হতে পারে না। যতদিন মানুষ বিশুদ্ধ তাওহীদ ও ফিতনামুক্ত চেতনা বিনির্মাণ করতে পারবে ততদিন তাদের এত উদ্যেগ ইত্যাদির কোনো মূল্য থাকবে না।
তবে এই রমাদানটা আমাদের জন্য ভ্রষ্টতা থেকে ফিরে আসার উসিলা হোক। আমাদেরকে যেন আল্লাহ তায়ালা শরীয়তের প্রতিটি বিধান মেনে সিয়াম পালনের তাওফীক দান করেন। আমরা যেন রমাদানকে শো-অফের জন্য গ্রহণ না করে এটাকে আত্মিক সাজসজ্জার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করি। আমাদের হৃদয়ের আঙ্গিনা যেন ফুলে ফুলে সুশোভিত হয়ে ওঠে কুরআন তিলাওয়াত, হাদীস অনুধাবন ও দীনী ইলমের ঝর্ণাধারায়। শুধু রমাদান না; আমাদের পরিবর্তনটা যেন হয় সারাজীবনের জন্য। সবাইকে রমাদান কারীমের মোবারকবাদ✨🌙